আজ বাইশের শেষ দিন।
আজ ৩১শে ডিসেম্বর, ইংরেজি বছরের শেষ দিন। আর কয়েক ঘণ্টা পরেই আসবে একটি নতুন বছর। তোমাদের অনেকের কাছেই হয়তো এই সালটি অনেক আনন্দে কেটেছে। আবার অনেকের কাছে কষ্টের। এই বছরে কেউ কত প্রিয়জনকে হারিয়েছে কেউবা নতুন বন্ধু পেয়েছে। হাজারো পাওয়া না পাওয়ার মাঝে কেটেছে বছরটি।
আমার কাছে এই বছরে যা পেয়েছি তার থেকে বেশি হারিয়েছি। বছরের শুরুটা ভালো ছিল, ২য় মাস অর্থাৎ ফেব্রুয়ারী মাসের ২য় দিন আমার দাদি মারা যান। আপনজন হারানোর কষ্ট কতটা ব্যথিত করে হৃদয়কে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার দাদি আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। আমার আব্বু তাদের ভাইদের মধ্যে ছোটো, সেজন্য দাদি আমাদের সাথেই থাকতেন। নিজের বাড়ি নিজের গ্রাম ছেড়ে দাদির শহুরে পরিবেশে দম বন্ধ হয়ে যেত, এমনটাই সব সময় বলতেন। আমার বড়ো কাকা ঢাক থাকেন, সেখানে দাদি থেকেছেন অনেকদিন কিন্তু তার মন ছটফট করতো বাড়ির জন্য। আবার চলে আসলেন আমাদের এখানে। আমি যেদিন জন্মগ্রহণ করি সেদিন আমার দাদা মারা যান, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধান ছিলো। আমার দাদা আমাকে দেখে যেতে পারেননি। সকালে দাদা মারা যান দুপুর ১২ টা ৪৮ মিনিটে আমি জন্মগ্রহণ করি। দাদার মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে পারে সবাই আমার মাধ্যমে। দাদাকে দেখিনি, ছোটো থেকে দাদিকে দেখেছি। কতটা ভালো মানুষ ছিলেন তা গ্রামের সবাই জানেন। কখনো রাগ করে থাকতেন না। কেউ কিছু বললে সাথে সাথে রাগ ভুলে আবার কথা বলতেন। একজন মাটির মানুষ ছিলেন আমার দাদি। দাদির এমন মৃত্যু সবচেয়ে বেশি আমাকে ব্যথিত করে।
আমার আব্বুকে আমি গত ২৫ বছরে কখনো কাঁদতে দেখিনি। কখনো কষ্ট হচ্ছে, খারাপ লাগছে বলতে শুনিনি। হাজার কষ্ট অসুস্থতার মাঝেও হাসি দিয়ে বলতেন আমি ঠিক আছি। আব্বুকে প্রথম কাঁদতে দেখেছি ২রা ফেব্রুয়ারিতে। যেদিন আমার দাদি মারা গেলেন। আব্বু আমাকে জড়িয়ে ধরে হাও মাও করে কেঁদেছিলেন। সেদিন বুঝলাম মা-কে হারানোর ব্যথা কতটা কষ্টদায়ক হয়।
এর ঠিক দুইমাস পর এপ্রিলের ৪ তারিখ আমার ছোটো ফুফু মারা গেলেন। দাদির শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতে আবারও আরেক আপনজনের মৃত্যু। রিতীমত সৃষ্টিকর্তার বিরাট এক পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। পর পর দুজনের মৃত্যু আমাদের সকল আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে শোকের ছায়া বিরাজ করছিল। আমার ছোটো ফুফুকে দেখেছি কত কষ্ট করেছেন জীবনে। বিয়ের পরও কখনো সুখে থাকতে পারেননি। ফুফা সারাজীবন কাটিয়ে দিলেন প্রবাসে, আজও প্রাবাসে আছেন। ফুফু মারা গেলেন কতটা কষ্ট নিয়ে স্বামী ছাড়া সংসার জীবন একাই পার করে পরলোক গমণ করলেন। ফুফুর এক মেয়ে নাম- 'বৃষ্টি', তার কোনো ইচ্ছায় অপূর্ণ রাখেননি। মেয়েকে বড়ো করেছেন একাই, মেয়ের সকল আবদার পূরণ করেছেন। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তাদের ঘরে একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তানও আছে নাম "আয়াত"। ফুফু সারাক্ষণ আয়াতকে নিয়েই থাকতেন। এতো তাড়াতাড়ি আমাদেরকে ছেড়ে চলে যাবেন তা হয়তো কেউ-ই ভাবতে পারেনি।
আমার দাদি, ফুফু পরপর দুজনের মৃত্যু। ২০২২ ইং সালে, আমার দুইজন আপন মানুষ কেড়ে নিয়েছে। কোনো প্রাপ্তি-ই এই আপনজনের ব্যথাকে উপশম করতে পারবে না।
তবুও জীবন থেমে থাকবে না, জীবন চলতে জীবনের নিয়মে। জন্ম হবে মৃত্যু আসবে এটাই নিয়ম এটাকে কেউ উপেক্ষা করে চলতে পারবে না।
সবশেষে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে এই প্রার্থনা করি, "আল্লাহ যেন দাদি ও ফুফু উভয়ের জীবনের সকল গুনাখাতা মাফ করে জান্নাতবাসী করেন।"-আমিন।
আর কিছুক্ষণ পরে এই বছরের শেষ সূর্য অস্তমিত হবে। সেই সূর্য অস্তমিত হওয়ার সাথে সাথে পুরাতন সব স্মৃতি মুছে ফেলে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে হবে। এটাই নিষ্ঠুর প্রকৃতির নিয়ম।
তবুও তোমাদের সবাইকে আসছে বছরের শুভেচ্ছা।
৩১ শে ডিসেম্বর ২০২২ ইং
~ মোঃ শাহারুখ হোসেন

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন